নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট চাষাড়া মোড়। কিন্তু শহরের এই প্রাণকেন্দ্রটিই দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসীর জন্য এক ধরনের ভোগান্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল হোক কিংবা বিকেল—ব্যস্ত সময়ে চাষাড়া পার হতে গিয়ে দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়া যেন অনেকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ।
এই যানজটের পেছনে বিভিন্ন কারণের কথা উঠে এলেও বারবার আলোচনায় আসে একটি বিষয়—অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা।
প্রশ্ন হচ্ছে, চাষাড়ার যানজটের জন্য কি তাহলে অটোরিকশাই দায়ী?
উত্তরটা সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার আগে সংখ্যাগুলো একটু ঠান্ডা মাথায় দেখা প্রয়োজন।
এক ঘণ্টায় শত শত অটোরিকশা
এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ব্যস্ত সময়ে চাষাড়া এলাকায় প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি অটোরিকশা অবস্থান করতে দেখা যায়। আবার একই সময়ে চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহনের হিসাব করলে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি অটোরিকশার উপস্থিতি দেখা যায়।
এই তথ্যকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হিসাব বলার সুযোগও কম।
চাষাড়া মোড়ের পরিবহন পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত ২০২৪ সালের একটি ট্রাফিক স্টাডিতে সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত এক দিকের সড়কে বাস, প্রাইভেটকার, ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ মোট ৭৮৩টি যানবাহন গণনা করা হয়। এর মধ্যে অটোরিকশাই ছিল ৩২৫টি। অর্থাৎ ওই দিকের মোট যানবাহনের প্রায় ৪১.৫ শতাংশ ছিল অটোরিকশা। গবেষণাটিতেও অটোরিকশার অতিরিক্ত উপস্থিতি ও সড়কের পাশে পার্কিংকে যানজটের গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ অটোরিকশার সংখ্যা যে চাষাড়া মোড়ের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় চাপ তৈরি করছে, সেটি শুধু চোখে দেখা ধারণা নয়; গবেষণার তথ্যেও তার প্রতিফলন রয়েছে।
সমস্যা অটোরিকশা, নাকি অটোরিকশার ‘দাঁড়িয়ে থাকা’?
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটা বুঝতে হবে।
একটি অটোরিকশা যদি যাত্রী নিয়ে স্বাভাবিকভাবে সড়ক দিয়ে চলাচল করে, তাহলে সেটি অন্য একটি গাড়ি বা মোটরসাইকেলের মতোই ট্রাফিকের অংশ। শুধু অটোরিকশা হওয়ার কারণেই সেটি যানজট তৈরি করবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
মূল সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন চলাচলের জন্য তৈরি সড়কটিকেই অস্থায়ী স্ট্যান্ডে পরিণত করা হয়।
চাষাড়ায় অটোরিকশাগুলোকে প্রায়ই নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডের পরিবর্তে যাত্রী পাওয়ার আশায় সড়কের পাশে কিংবা মোড়ের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কেউ যাত্রী ওঠাচ্ছে, কেউ যাত্রীর অপেক্ষায় আছে, আবার কেউ সামনে থাকা অটোরিকশা ছাড়ার অপেক্ষায় সারি তৈরি করছে।
ফলে চার লেনের রাস্তা কার্যত তিন লেন, কোথাও কোথাও দুই লেনে পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এভাবে যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কোনো কোনো অংশে ব্যবহারযোগ্য সড়কের প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত জায়গা কার্যত আটকে যাচ্ছে।
একটি ব্যস্ত মোড়ে সড়কের এত বড় অংশ যদি চলাচলের পরিবর্তে পার্কিং বা যাত্রী তোলার কাজে ব্যবহার হয়, তাহলে পেছনের গাড়িগুলোর গতি কমে আসা স্বাভাবিক। একটি অটোরিকশা থামলে পেছনের গাড়ি ব্রেক করে, পাশের লেনে ঢোকার চেষ্টা করে; সেখান থেকে তৈরি হয় আরেকটি বাধা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছোট একটি প্রতিবন্ধকতা বড় যানজটে রূপ নেয়।
চাষাড়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট: অবৈধ স্ট্যান্ডের দীর্ঘ সারি
সমস্যাটি শুধু চাষাড়া গোলচত্বরেই সীমাবদ্ধ নয়।
নারায়ণগঞ্জের অবৈধ সিএনজি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চাষাড়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৩টি অবৈধ সিএনজি, অটো ও লেগুনা স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছিল।
চাষাড়া বাইতুল আমান মসজিদের দুই পাশ, রাইফেলস ক্লাবের সামনে, লাজ ফার্মা, খাজা সুপার মার্কেট, সোনালী ব্যাংক, শহীদ মিনার এলাকা, মহিলা কলেজসহ ব্যস্ত বিভিন্ন পয়েন্টে এসব স্ট্যান্ডের উপস্থিতির কথা ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে।
ফলে সমস্যাটি একটি মোড়ে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো গুরুত্বপূর্ণ করিডোরজুড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যানবাহন দাঁড়ানোর একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
অভিযান হচ্ছে, কিন্তু সমাধান কি স্থায়ী হচ্ছে?
চাষাড়ার যানজট কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেলা প্রশাসন চাষাড়া এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দোকানের পাশাপাশি সড়কের ওপর থাকা অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে। যানজট নিরসনের জন্য অভিযান অব্যাহত রাখার কথাও সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। চাষাড়ায় অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদের সেই খবরটি পড়ুন
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—অভিযানের পর পরিস্থিতি কতদিন স্বাভাবিক থাকে?
কারণ পরবর্তী সময়ের প্রতিবেদনেও আবার একই জায়গায় অবৈধ স্ট্যান্ড এবং অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। এমনকি হকার উচ্ছেদের পরও নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট পুরোপুরি না কমার অন্যতম কারণ হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অটো, সিএনজি ও লেগুনার অবৈধ স্ট্যান্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্ছেদের পরও কেন যানজট কমছে না—এ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন
এখানেই হয়তো সমস্যার মূল জায়গাটি।
শুধু অটোরিকশা সরালেই কি যানজট শেষ?
সম্ভবত না।
কারণ চাষাড়ার যানজটের জন্য অটোরিকশার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় কাজ করছে।
চাষাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এখানে বাস, প্রাইভেটকার, রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং পথচারী—সবাই একই সীমিত জায়গা ব্যবহার করছে। এর সঙ্গে রয়েছে অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, ফুটপাত ও সড়কের দখল, ট্রাফিক আইন না মানা, সংকীর্ণ সড়ক এবং রেলক্রসিংয়ের প্রভাব।
২০২৪ সালের ট্রাফিক গবেষণাতেও চাষাড়ার যানজটের জন্য শুধু অটোরিকশাকে দায়ী করা হয়নি। সেখানে দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত সড়ক নেটওয়ার্ক, অবৈধ পার্কিং, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং রেলক্রসিংয়ের মতো একাধিক সমস্যার কথা বলা হয়েছে।
তবে একই গবেষণায় অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, একাধিক অনিয়ন্ত্রিত স্ট্যান্ড বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট অটোস্ট্যান্ড তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে।
অর্থাৎ সমস্যাটা ‘অটোরিকশা আছে’—এখানে নয়।
সমস্যাটা হচ্ছে অটোরিকশা কোথায় থাকবে, কোথায় যাত্রী তুলবে এবং কতগুলো অটোরিকশা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় চলবে—তার কার্যকর ব্যবস্থাপনা না থাকা।
তাহলে সমাধান কোথায়?
চাষাড়ার মতো একটি ব্যস্ত মোড়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট হবে না।
প্রথমেই প্রয়োজন চাষাড়া ও আশপাশের এলাকায় নির্দিষ্ট pick-up এবং drop-off point তৈরি করা। মূল মোড় থেকে কিছুটা দূরে পরিকল্পিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড করা গেলে যাত্রীরাও গাড়ি পাবেন, আবার মূল সড়কও আটকে থাকবে না।
একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কতগুলো অটোরিকশা চাষাড়া এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে, সেটিরও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
অবৈধভাবে সড়কের ওপর গাড়ি দাঁড় করানো বন্ধ করার পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ জরুরি। কয়েক ঘণ্টার অভিযান করে সড়ক পরিষ্কার করার পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বলা যায় না।
প্রয়োজনে প্রযুক্তির সাহায্যে ডিজিটাল নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, স্ট্যান্ডভিত্তিক যানবাহনের সংখ্যা এবং চালকদের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
অটোরিকশা প্রয়োজন, কিন্তু সড়কও সবার
বাস্তবতা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জের হাজারো মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল। তাই শহর থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়াই সমাধান—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
একইভাবে হাজারো মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বড় একটি অংশ যদি অঘোষিত পার্কিং স্ট্যান্ডে পরিণত হয়, সেটিও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাই প্রশ্নটা “অটোরিকশা থাকবে কি থাকবে না?”—এটা হওয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—অটোরিকশা কোথায় থাকবে এবং কীভাবে চলবে?
চাষাড়ার যানজটের জন্য শুধু একটি যানবাহনকে দায়ী করলে সমস্যার পুরো চিত্র ধরা পড়বে না। তবে প্রতিদিন শত শত অটোরিকশা যদি যাত্রী নেওয়ার জন্য মূল সড়ক দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে যানজটের বড় একটি অংশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
অটোরিকশাকে বাদ দিয়ে নয়, বরং পরিকল্পনার মধ্যে এনে নিয়ন্ত্রণ করাই হতে পারে চাষাড়ার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
